Quire
রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ চর্যাপদ এর অংশবিশেষ
রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ চর্যাপদ এর অংশবিশেষ Image: source and license
বাংলা সাহিত্য
চর্যাপদ পুথি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া, মীর মশাররফ হোসেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, জীবনানন্দ দাশ, স্বর্ণকুমারী দেবী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জসীম উদ্দিন, হুমায়ূন আহমেদ
বাংলা সাহিত্য
(বিষয়শ্রেণী তালিকা)
বাংলা ভাষা
সাহিত্যের ইতিহাস
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস
বাঙালি সাহিত্যিকদের তালিকা
কালানুক্রমিক তালিকা - বর্ণানুক্রমিক তালিকা
বাঙালি সাহিত্যিক
লেখক - ঔপন্যাসিক - কবি
সাহিত্যধারা
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয়
চর্যাপদ - মঙ্গলকাব্য - বৈষ্ণব পদাবলি ও সাহিত্য - নাথসাহিত্য - অনুবাদ সাহিত্য -ইসলামী সাহিত্য - শাক্তপদাবলি - বাউল গান
আধুনিক সাহিত্য
উপন্যাস - কবিতা - নাটক - ছোটোগল্প - প্রবন্ধ - শিশুসাহিত্য - কল্পবিজ্ঞান
প্রতিষ্ঠান ও পুরস্কার
ভাষা শিক্ষায়ন
সাহিত্য পুরস্কার
সম্পর্কিত প্রবেশদ্বার
সাহিত্য প্রবেশদ্বার
বঙ্গ প্রবেশদ্বার

চর্যাপদ (বাংলা উচ্চারণ: [t͡ʃord͡ʒapɔd]; চোর‍্জাপদ্) বা চর্যাগীতি হলো মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত তথা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোঁহা গ্রন্থে সংকলিত চব্বিশজন (মতান্তরে তেইশজন) বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য রচিত সাড়ে ছেচল্লিশটি গান। এই গানগুলিতে বৌদ্ধধর্মের গূঢ় সাধনপ্রণালী ও দর্শনতত্ত্ব নানা রূপকে মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত এই পদগুলির যেমন সাহিত্যমূল্য রয়েছে, তেমনই এগুলিতে প্রাচীন বাঙালি সমাজের ছবিও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

বাংলা ভাষার পূর্ববর্তী রূপ অপভ্রংশ থেকে ঠিক কোন সময়ে এই ভাষা নিজস্ব পরিচয়ে চিহ্নিত হয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা তর্কসাপেক্ষ। তবে বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন হিসেবে গবেষকেরা চর্যাগীতিগুলিকেই স্বীকার করে নিয়েছেন। অনেকে এটিকে বাংলাভাষার আদি নির্দশন বলে চেনেন। অবশ্য এই গানগুলির প্রথম রচনাকাল সম্পর্কে গবেষকরা কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেননি।[1]

আবিষ্কার#edit

চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় পুঁথির আবিষ্কর্তা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় পুঁথির আবিষ্কর্তা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী Image: source and license

সাহিত্যকর্ম হিসেবে চর্যাপদ প্রাচীন রচনা হলেও এটির আবিষ্কার সাম্প্রতিক কালের ঘটনা। ১৮৫৮ সালে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র বিবিধার্থ সংগ্রহ পত্রিকায় "বঙ্গভাষার উৎপত্তি" প্রবন্ধে বাংলা হিন্দি ভাষার পূর্বী শাখা থেকে উৎপন্ন বলে বর্ণনা করেন এবং বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে বিদ্যাপতির রচনাবলিকে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ১৯১১ সালে প্রকাশিত দীনেশচন্দ্র সেনের দ্য হিস্ট্রি অফ বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার গ্রন্থে বাংলা সাহিত্যের আদিপর্বে বৌদ্ধ প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হলেও লেখক প্রধানত গোপীচন্দ্রের গান, ডাক-খনার বচন ইত্যাদি কতকগুলি লৌকিক উপাদানের আলোচনার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। সেই সময় উপযুক্ত প্রমাণ সুলভ ছিল না বলে এই-সব আলোচনার মধ্যে তথ্যপ্রমাণ অপেক্ষা অনুমানের স্থানই ছিল প্রশস্ত।[2]

নেপাল ও তিব্বতে রক্ষিত বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের পুঁথিপত্রের প্রতি প্রথম ইউরোপীয় গবেষকদেরই দৃষ্ট আকর্ষিত হয়েছিল। ব্রায়ান হজসন নামে এক ইংরেজ অভিযাত্রী নেপাল থেকে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের অনেকগুলি পুঁথি আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারের পর তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস রচনা ও শাস্ত্রগ্রন্থ সম্পাদনার বিষয়ে গবেষকেরা বিশেষ উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। ১৮৪৪ সালে ইউজিন বার্নোফ প্রথম এই কাজে বিশেষ তৎপর হয়েছিলেন। এরপর আরও অনেক গবেষক পুঁথির সন্ধানে বহুবার নেপাল যাত্রা করেন। এঁদের মধ্যে ব্রায়ান রাইট ও সিসিল বেন্ডালের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁদের দেখাদেখি বাঙালি গবেষকেরাও এই কাজে এগিয়ে আসেন। রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র নেপালে গিয়ে সংস্কৃত ভাষায় লেখা বিভিন্ন বৌদ্ধপুঁথির অনুসন্ধান করেন। ১৮৮২ সালে সংস্কৃত বুদ্ধিস্ট লিটারেচার ইন নেপাল নামে তিনি একটি পুঁথির তালিকা প্রকাশ করেন। রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর সরকার মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উপর বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামে পুঁথির অনুসন্ধান ও সংগ্রহের দায়িত্ব প্রদান করে। রাজেন্দ্রলালের তালিকা ও নতুন আবিষ্কৃত আরও কয়েকটি পুঁথির ভিত্তিতে হরপ্রসাদের মনে হয় যে, নেপালের নানা জায়গায় বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত অনেক পুঁথি রয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই-সব উপকরণগুলি একান্ত অপরিহার্য।[3]

এই উপকরণগুলি সংগ্রহের জন্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তিনবার নেপাল ভ্রমণ করেন। ১৮৯৭ সালে প্রথম তিনি বৌদ্ধ পুঁথি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নেপাল গিয়েছিলেন। ১৮৯৮ সালে দ্বিতীয়বার নেপাল ভ্রমণের সময়েও তিনি কিছু বৌদ্ধ পুঁথিপত্র সংগ্রহ করেন। ১৯০৭ সালে তৃতীয়বার নেপাল ভ্রমণকালে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় নামে একটি খণ্ডিত পুঁথি তিনি নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থশালা থেকে আবিষ্কার করেন। স্থানীয় অঘোরী তান্ত্রিকগণ হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে চর্যাপদের মূললিপির খোঁজ সরবরাহ করেছিলেন।[4] এই চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়, সরহপাদের দোহা, অদ্বয়বজ্রের সংস্কৃত পুঁথি সহজাম্নায়পঞ্জিকা, কৃষ্ণাচার্য বা কাহ্নপাদের দোহা, আচার্যপাদের সংস্কৃত মেখলা টীকা এবং পূর্বাবিষ্কৃত ডাকার্ণব পুঁথি একত্রে ১৯১৬ সালে (শ্রাবণ, ১৩২৩ বঙ্গাব্দ) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা শিরোনামে সম্পাদকীয় ভূমিকা সহ প্রকাশ করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।[5] উল্লেখ্য, সংস্কৃত রচনাগুলি বাদে বাকি সব ক’টি পুঁথির ভাষাই হরপ্রসাদ প্রাচীন বাংলা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালের গবেষকেরা প্রমাণ করেন যে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় পুঁথিটির ভাষাই বাংলা, অন্য তিনটি পুঁথি পশ্চিমা অপভ্রংশ ভাষায় রচিত।[6]

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় পুঁথিতে ছেচল্লিশটি পূর্ণাঙ্গ একটি খণ্ডিত গান পেয়েছিলেন। পুঁথির কয়েকটি পৃষ্ঠা ছিল ছেঁড়া। প্রবোধচন্দ্র বাগচী চর্যার যে তিব্বতি অনুবাদ সংগ্রহ করেন, তাতে খণ্ডিত ২৩ সংখ্যক গানের শেষাংশ এবং ২৪, ২৫ ও ৪৮ সংখ্যক গানগুলিরও অনুবাদ পাওয়া যায়।[7] তাতে বোঝা যায়, মূল পুঁথিতে মোট একান্নটি গান ছিল।[8][9] হরপ্রসাদ মনে করেন, তাঁর আবিষ্কৃত পুঁথিটিই চর্যাপদের মূল পুঁথি এবং সেটির নাম চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়। কিন্তু সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের আবিষ্কারের সূত্র ধরে যে তিব্বতি অনুবাদটি প্রবোধচন্দ্র বাগচী আবিষ্কার করেন, তাতে দেখা যায় মূল পুঁথিটির নাম ছিল চর্য্যাগীতিকোষবৃত্তি। বস্তুত হরপ্রসাদ আবিষ্কৃত পুঁথিটি মূল পুঁথি থেকে নির্বাচিত একান্নটি গানের সংকলন ও তার টীকাগ্রন্থ।[10][11]

নামকরণ#edit

আবিষ্কৃত পুঁথিতে চর্যা-পদাবলিয় যে নাম পাওয়া যায় সেটি হল 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়'। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থে এই নামটিই ব্যবহার করেছেন, সংক্ষেপে এটি ‘বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’ বা ‘চর্যাপদ’ নামেও অভিহিত হয়ে থাকে।[12] কিন্তু আবিষ্কৃত পুঁথিটি যেহেতু মূল পুঁথি নয়, মূল পুঁথির নকলমাত্র এবং মূল পুঁথিটি (তিব্বতি পুঁথি) যেহেতু এ পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত, সেই কারণে পরবর্তীকালে চর্যা-পদাবলির প্রকৃত নাম নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

মহামহোপাধ্যায় বিধুশেখর শাস্ত্রী ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে চর্যার প্রথম পদের সংস্কৃত টীকাটি (শ্রীলূয়ীচরণাদিসিদ্ধরচিতেঽপ্যাশ্চর্যচর্যাচয়ে। সদ্বর্ত্মাবগমায় নির্ম্মল গিরাং টীকাং বিধাস্যে স্ফুটনম।।) উদ্ধৃত করে শ্লোকাংশের 'আশ্চর্যচর্যাচয়' কথাটিকে গ্রন্থনাম হিসাবে গ্রহণ করার প্রস্তাব রাখেন। তাঁর মতে, 'আশ্চর্যচর্যাচয়' কথাটিই নেপালী পুঁথি নকলকারীর ভুলবশত 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়' হয়েছে। তবে এই মতের যথার্থতা বিষয়ে আচার্য অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সন্দেহ প্রকাশ করেন।[13] প্রবোধচন্দ্র বাগচী ওই একই সূত্র ধরে চর্যা-পুঁথির নাম 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়' রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু আচার্য অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই মত খণ্ডন করে লিখেছেন, "'আশ্চর্যচর্যাচয়' নামটিও অযুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়' ও 'আশ্চর্যচর্যাচয়', দুই নামকে মিলিয়ে 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়' নামটি গ্রহণ করা যায় না। কারণ এই 'জোড়কলম' শব্দটি আধুনিক পণ্ডিতজনের পরিকল্পিত।"[14]

আধুনিক গবেষকগণ তেঙ্গুর গ্রন্থমালা (Bastan-hgyar) থেকে অনুমান করেন মূল পুঁথিটির নাম ছিল চর্যাগীতিকোষ এবং তার সংস্কৃত টীকাটি 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়' — অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই মত গ্রহণ করেছেন।[15]

রচনাকাল#edit

চর্যার রচনার সময়কাল নিয়েও ইতিহাস গবেষকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও প্রবোধচন্দ্র বাগচীর মতে চর্যার পদগুলি খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত। কিন্তু ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ[16] ও রাহুল সাংকৃত্যায়ন এই সময়কালকে আরও ২০০ বছর পিছিয়ে দিয়ে চর্যার রচনাকাল খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী বলে মতপ্রকাশ করেছেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮০ – ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দ) তিব্বত যাত্রার পূর্বে (১০৩০ খ্রিস্টাব্দ) লুইপাদের অভিসময়বিহঙ্গ রচনায় সাহায্য করেছিলেন। একথা যদি সত্য হয় তবে লুইপাদের দশম শতাব্দীর শেষভাগেও বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকার কথা। অপরদিকে তিব্বতি কিংবদন্তি অনুসারে তিনিই সিদ্ধাচার্যদের আদিগুরু। অর্থাৎ, চর্যার সময়কালও দশম শতাব্দীর পূর্বে হতে পারে না।[15]

অন্যদিকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে হেবজ্রপঞ্জিকাযোগরত্নমালা নামে এক বৌদ্ধতান্ত্রিক পুঁথির সন্ধান মেলে, যেটির রচনাকাল শেষ পালরাজা গোবিন্দপালের (১১৫৫ খ্রিস্টাব্দ) শাসনকাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুঁথির রচয়িতা শ্রীকৃষ্ণাচার্যই প্রকৃতপক্ষে চর্যার কাহ্নপাদ বা চর্যা-টীকার কৃষ্ণাচার্য। নাথ সাহিত্য অনুযায়ী কাহ্নপাদের গুরু জালন্ধরিপাদ বা হাড়িপা, যিনি গোরক্ষনাথের শিষ্য ছিলেন। আবার মারাঠি গ্রন্থ জ্ঞানেশ্বরী (রচনাকাল আনুমানিক ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ) থেকে জানা যায় উক্ত গ্রন্থের রচয়িতা জ্ঞানদেব দীক্ষালাভ করেন নিবৃত্তিনাথের কাছ থেকে, যিনি গোরক্ষনাথের শিষ্য গেইনীনাথ বা গোয়নীনাথের থেকে দীক্ষাপ্রাপ্ত। সেই হিসাবেও কাহ্নপাদকে দ্বাদশ শতাব্দীর মানুষ বলে মনে করা হয়।[15]

এইসব তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে চর্যার পদগুলি খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বলেই অনুমিত হয়। তবে তার পরেও দু-তিনশো বছর ধরে গোপনে চর্যাগীতি রচিত হয়েছিল। শশিভূষণ দাশগুপ্ত নেপাল ও তরাই অঞ্চল থেকে এই ধরনের শতাধিক পদ উদ্ধার করেছেন ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে। এগুলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ১৯৮৯ সালে নব চর্যাপদ নামে সংকলিত ও প্রকাশিত হয়।[17]

কবি#edit

চর্যার কবিগণ সিদ্ধাচার্য নামে পরিচিত; সাধারণত বজ্রযানী ও সহজযানী আচার্যগণই এই নামে অভিহিত হতেন। তিব্বতি ও ভারতীয় কিংবদন্তিতে এরাই 'চৌরাশি সিদ্ধা' নামে পরিচিত। তবে এই ৮৪ জন সিদ্ধাচার্য আসলে কারা ছিলেন তা সঠিক জানা যায় নি।[18]

চর্যার কবিরা ছিলেন পূর্ব ভারত ও নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী। কেউ পূর্ববঙ্গ, কেউ উত্তরবঙ্গ, কেউ বা রাঢ়ের অধিবাসী ছিলেন। কেউ কেউ বিহার, কেউ ওড়িশা, কেউ বা আবার অসম বা কামরূপের বাসিন্দাও ছিলেন।[19] লুই পার মত সিদ্ধাচার্যদের অনেকেই অঘোরী সম্প্রদায়ভূক্ত ছিলেন।[4]

আবিষ্কৃত পুঁথিটিতে ৫০টি চর্যায় মোট ২৪ জন সিদ্ধাচার্যের নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন: লুই, কুক্কুরী, বিরুআ, গুণ্ডরী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কাম্বলাম্বর, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, শবর, আজদেব, ঢেণ্ঢণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জয়নন্দী, ধাম, তান্তী পা, লাড়ীডোম্বী। এদের মধ্যে লাড়ীডোম্বীর পদটি পাওয়া যায়নি। ২৪, ২৫ ও ৪৮ সংখ্যক পদগুলি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুঁথিতে না থাকলেও ডক্টর প্রবোধচন্দ্র বাগচী আবিষ্কৃত তিব্বতি অনুবাদে এগুলির রচয়িতার নাম উল্লিখিত হয়েছে যথাক্রমে কাহ্ন, তান্তী পা ও কুক্কুরী।[20] এই নামগুলির অধিকাংশই তাদের ছদ্মনাম এবং ভনিতার শেষে তারা নামের সঙ্গে 'পা' (<পদ) শব্দটি সম্ভ্রমবাচক অর্থে ব্যবহার করতেন।

সাধারণভাবে লুইপাদকেই আদি সিদ্ধাচার্য মনে করা হয়। তাঞ্জর বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ছিলেন বাঙালি। তিনি মগধের বাসিন্দা ছিলেন ও রাঢ় ও ময়ূরভঞ্জে আজও তার নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। চর্যার টীকায় তার অন্য নাম লূয়ীপাদ বা লূয়ীচরণ। ১ ও ২৯ সংখ্যক পদদুটি তার রচিত।[21]

চর্যার পুঁথিতে সর্বাধিক সংখ্যক পদের রচয়িতা কাহ্ন বা কাহ্নপাদ। তিনি কৃষ্ণাচার্য, কৃষ্ণপাদ ও কৃষ্ণবজ্র নামেও পরিচিত। তার রচিত পদের সংখ্যা ১৩টি। পুঁথিতে তাঁর মোট ১২টি পদ (পদ – ৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৮, ১৯, ৩৬, ৪০, ৪২ ও ৪৫) পাওয়া যায়।[21] তার রচিত ২৪ নম্বর পদটি পাওয়া যায়নি। ইনি ওড়িশার এক ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন বলে জানা যায়। শৌরসেনী অপভ্রংশ ও মাগধী অপভ্রংশজাত বাংলায় তিনি পদ রচনা করতেন।[22]

ভুসুকুপাদ বাঙালি ছিলেন বলে অনেকের অনুমান। কেউ কেউ তাকে চর্যাগানের শান্তিপাদের সঙ্গে অভিন্ন মনে করেন।[23] চর্যার পুঁথিতে তাঁর আটটি পদ (পদ – ৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯) আছে।[21]

এছাড়া সরহপাদ চারটি (পদ – ২২, ৩২, ৩৮, ৩৯), কুক্কুরীপাদ তিনটি (পদ – ২, ২০, ৪৮) এবং শান্তিপাদ (পদ – ১৫ ও ২৬) ও শবরপাদ দুইটি পদ (পদ – ২৮ ও ৫০) রচনা করেন। একটি করে পদ রচনা করেন বিরুআ (পদ ৩), গুণ্ডরী (পদ ৪), চাটিল (পদ ৫), কম্বলাম্বরপাদ (পদ ৮), ডোম্বীপাদ (পদ ১৪), মহিণ্ডা (পদ ১৬), বীণাপাদ (পদ ১৭), আজদেব (পদ ৩১), ঢেণ্ঢণ (পদ ৩৩), দারিক (পদ ৩৪), ভদ্রপাদ (পদ ৩৫), তাড়ক (পদ ৩৭), কঙ্কণ (পদ ৪৪), জয়নন্দী (পদ ৪৬), ধাম (পদ ৪৭) ও তান্তী পা (পদ ২৫, মূল বিলুপ্ত)। নাড়ীডোম্বীপাদের পদটি পাওয়া যায় না।[24]

প্রকৃতি#edit

চর্যাপদের ভাষা বরং প্রতীকী প্রকৃতির। তাই অনেক ক্ষেত্রে কোনো শব্দের আভিধানিক অর্থের কোনো মানে হয় না। ফলস্বরূপ, প্রতিটি কবিতার একটি বর্ণনামূলক বা বর্ণনামূলক পৃষ্ঠের অর্থ রয়েছে তবে তান্ত্রিক বৌদ্ধ শিক্ষাকেও সংকেতায়িত করে। কিছু বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে, এটি ছিল অপ্রশিক্ষিতদের কাছ থেকে পবিত্র জ্ঞান গোপন করার জন্য, অন্যরা মনে করে যে এটি ধর্মীয় নিপীড়ন এড়াতে করা হয়েছে। চর্যাপদের গোপন তান্ত্রিক অর্থের পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়েছে।[25][26]

ভাষা#edit

চর্যাপদের ভাষা বাংলা কি-না সে বিষয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল পরবর্তীকালে যার অবসান হয়েছে। এটি সৃজ্যমান বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। চর্যাপদের রচয়িতা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ সংস্কৃতে পারদর্শী হলেও তাঁরা তৎকালীন অপরিণত বাংলাতেই পদগুলি রচনা করেছিলেন। চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার অদ্যাবধি আবিষ্কৃত আদিতম রূপ। এই ভাষা সম্প্রদায় বিশেষের সাধন-সঙ্গীতের ভাষা বিধায় অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য; যদিও এতে উল্লিখিত ছন্দ ও রাগ-রাগিনী পরবর্তীকালের বাঙালি কবিদের পথনির্দেশিকারূপে কাজ করে। তবে প্রাচীন কবিদের মতে এটিতে সন্ধ্যা বা আলোআঁধারি ভাষা ব্যবহার করা হয় সেইসাথে গদ্য ছন্দ ব্যবহৃত করা হয় । চর্যাপদের রচয়িতা ভুসুকপার বাড়ি ছিল বাংলায় , যা তার লেখায় উল্লেখিত[27]-

বাজ ণাব পাড়ী পউআঃ খালেঁ বাহিউ

অদঅ বঙ্গালে ক্লেশ লুড়িউ॥ ধ্রু॥

আজি ভুসু বঙ্গালী ভইলী

ণিঅ ঘরিণী চণ্ডালী লেলী। ধ্রু॥[28] -ভুসুকপার রচনা

ভাষা-বিতর্ক#edit

চর্যা পদসংগ্রহ প্রকাশিত হবার পর চর্যার ভাষা নিয়ে যেমন প্রচুর গবেষণা হয়েছে, তেমনি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্বজ্জনেরা এই ভাষার উপর নিজ নিজ মাতৃভাষার অধিকার দাবি করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। চর্যার পদগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের কবিদের দ্বারা লিখিত, এবং এটা স্বাভাবিক যে তাদের লেখায় তাদের নিজেদের অঞ্চলের ভাষারূপ বা উপভাষার প্রভাবই পাওয়া যাবে। বিভিন্ন পণ্ডিত চর্যাপদের ভাষার সাথে অসমীয়া, ওড়িয়া, বাংলা ও মৈথিলী ভাষার সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছেন।[29] সমসাময়িক ঝাড়খণ্ডী ভাষা গবেষকগণ মনে করেন, চর্যাপদের নিকটতম ভাষা হলো কুুড়মালি ভাষা।[30][31]

ভাষা ও ভাষাতাত্ত্বিক বিতর্ক#edit

চর্যাপদের ভাষা নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই একে প্রাচীন বাংলা ভাষার প্রাথমিক রূপ বলে চিহ্নিত করেছেন, তবে একদল পণ্ডিত মনে করেন এটি বাংলা, অওধি, মাগধি প্রভৃতি পূর্বভারতের প্রাচীন উপভাষার সংমিশ্রণ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের ভাষাকে "অবহট্ঠ হতে বাংলা ভাষার উত্তরণকালীন রূপ" হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং একে "Proto-Bengali" বা "আদ্য বাংলা" বলেন। অন্যদিকে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় এবং সুকুমার সেন চর্যাপদকে মধ্যভারতীয় অপভ্রংশ ধারার ভাষাগত নিদর্শন বলেও অভিহিত করেছেন। এই ভাষার বৈশিষ্ট্যে সংস্কৃত, প্রাকৃত এবং অপভ্রংশের উপাদান যেমন আছে, তেমনি আছে ধাম্মপদের পালি ভাষার ছায়া। চর্যাগীতিগুলিতে ব্যবহৃত রূপ, ধ্বনি ও শব্দচয়ন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—আঞ্চলিকতা ও কাব্যিক সংকেতের মিলনে একটি বহুধা-উৎপত্তির ভাষা গঠিত হয়েছে, যার ওপর বাংলা ভাষার পরবর্তী বিকাশ নির্ভর করে। [32] [33] [34]

বাংলা ভাষার সাথে সম্পর্ক#edit

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তার সম্পাদিত হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোহা গ্রন্থের ভূমিকায় চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপাদ ও কৃষ্ণাচার্যের দোহা এবং ডাকার্ণব-কে সম্পূর্ণ প্রাচীন বাংলার নিদর্শন বলে দাবি করেছেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের আবিষ্কর্তা ও সম্পাদক বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভও তার দাবিকে সমর্থন করেন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে বিজয়চন্দ্র মজুমদার তাদের দাবি অস্বীকার করে চর্যা ও অন্যান্য কবিতাগুলির সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্বন্ধের দাবি নস্যাৎ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে চর্যাগান ও দোহাগুলির ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও ছন্দ বিশ্লেষণ করে শুধুমাত্র এইগুলিকেই প্রাচীন বাংলার নিদর্শন হিসাবে গ্রহণ করেন। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্যারিস থেকে প্রকাশিত Les Chants Mystique de Saraha et de Kanha গ্রন্থে সুনীতিকুমারের মত গ্রহণ করেন।[35] জয়দেবের গীতগোবিন্দের কিছু লেখায় "অর্ধ-মাগধী পদাশ্রিত গীতি" রয়েছে যেগুলো চর্যাগীতি দ্বারা প্রভাবিত।[36] কবি জয়দেবের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূমের কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি গ্রামে। তার নামে সেখানে প্রতি বছর মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

সিদ্ধাচার্যদের অনেকেই ছিলেন বাংলার অধিবাসী। শবরপা, কুক্কুরিপা ও ভুসুকুপা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। যে সকল ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য চর্যার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ককে প্রমাণ করে সেগুলি হল:[37]

  • সম্বন্ধ পদে – অর বিভক্তি (-era, -ara), সম্প্রদানে –কে, সম্প্রদানবাচক অনুসর্গ – অন্তরে (মধ্যযুগীয় ও আধুনিক রূপ – তরে), অধিকরণে – অন্ত, – ত, অধিকরণবাচক অনুসর্গ – মাঝে (majha), অতীত ক্রিয়ায় – ইল (-ila-) যেমন: দিল, নিল, চলিল ইত্যাদি এবং উত্তম পুরুষের ভবিষ্যত ক্রিয়ায় – ইব (-iba-) যেমন: করিব, যাইব, ভাইব (ভাবিব) ইত্যাদি। চর্যা মৈথিলী বা পূরবীয়া হিন্দিতে রচিত হলে অতীত ক্রিয়ায় – অল্ ও ভবিষ্যতে – অব্ যুক্ত হত।
  • নাম বিভক্তি — এ (-e) বিভক্তিটি মধ্যযুগীয় বাংলাসহ আধুনিক বাংলায়ও বহুল ব্যবহৃত হয়। যেমন - চোরে নিল, কুম্ভীরে খাঅ ইত্যাদি।
  • গুনিয়া, লেহঁ, দিল, চোরে নিল, ভণিআঁ, সড়ি, পড়িআঁ, উঠে গেল, আখি বুজিঅ, ধরন ন জাঅ, কহন না জাই, পার করেই, আইসসি-যাসি (আসিস-যাস), যেতই বলে, নিদ গেল, করিব, যাইব, দিবি, আপনা মাংসে হরিণা বৈরী, হাড়ীত ভাত নাহি, গুরু বোব সীসা কাল (গুরু বোবা শিষ্যা কালা) ইত্যাদি চর্যাকালের বাগভঙ্গিমা ও শব্দযোজনা বাংলা ভাষায় পরবর্তীকালেও সুলভ। এর সঙ্গে অবশ্য তসু, জৈসন, জিস, কাঁহি, পুছমি প্রভৃতি পশ্চিমা অপভ্রংশের শব্দও আছে। তবে সেগুলি মূলত ঋণকৃত শব্দ হিসাবেই চর্যায় ব্যবহৃত হয়েছে।
  • এছাড়া সম্প্রদানে – ক এবং – সাথ, – লাগ, – লগ-এর বদলে সঙ্গে, সম অনুসর্গের ব্যবহার এবং নাসিক্যধ্বনির বাহুল্যের জন্য চর্যার ভাষাকে রাঢ় অঞ্চলের ভাষা বলে মনে করা হয়। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “চর্যার আচার্যেরা কামরূপ, সোমপুরী, বিক্রমপুর – যেখান থেকেই আসুন না কেন, আশ্চর্যের বিষয়, এঁরা সকলেই রাঢ় অঞ্চলের ভাষানীতি গ্রহণ করেছিলেন।”[37]
  • না বোধক অব্যয় - মধ্যযুগীয় বাংলা থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাতেও বিভিন্ন পদ্য সাহিত্য যেমন- কবিতা ও গানে ক্রিয়াপদের আগে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া পশ্চিম রাঢ়ের কথ্য বাংলাতেও এইরকম পরিলক্ষিত হয়। যেমন: না যাই, না জীবমী ইত্যাদি।
  • দ্বিতীয় পুরুষ প্রত্যয় -asi/si, যা আধুনিক বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে -is/s হয়েছে। যেমন: আইসসি > আসিস, বুঝসি > বুঝিস, যাসি > যাস ইত্যাদি।
  • সাধারণ বর্তমান ক্রিয়া রূপ - চর্যাপদের ভাষার প্রত্যয় -ai আধুনিক বাংলায় -e রূপে পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। যেমন: চড়ই > চড়ে, বসই > বসে, ভনই > ভনে, নাচই > নাচে ইত্যাদি।
  • এগুলো ছাড়াও, অধিকরণ কারক-Te; কর্তৃকারক -Ta ; সাধারণ বর্তমান কালের ক্রিয়া -Ai (-আই); অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় যেমন antara (অন্তর), sanga (সঙ্গ); বর্তমান কৃদন্ত (প্রেসেন্ট পার্টিসিপল) – anta (-অন্ত) ; কনজাংকটিভ ইনডেক্লাইনেবল -ia; কনজাংকটিভ কন্ডিশনাল -ite ; প্যাসিভ -ia- ও সাবস্টেনসিভ রুট ach (আছ) এবং thak (থাক) চর্যাপদের ভাষার সাথে বাংলার সাদৃশ্যকেই নির্দেশ করে।[38]

রাহুল সাংকৃত্যায়ন বা অন্যান্য ভাষার বিদ্বজ্জনেরা যাঁরা চর্যাকে নিজ নিজ ভাষার প্রাচীন নিদর্শন বলে দাবি করেছিলেন, তাঁরা এই রকম সুস্পষ্ট ও সুসংহত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের দ্বারা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন নি।

অসমীয় ভাষার সাথে সম্পর্ক#edit

লুই পা কামরূপের বাসিন্দা ছিলেন এবং তিনি দুটি চর্যা রচনা করেছিলেন। আরেকজন কবি সরহ পা বর্তমান গুয়াহাটির কাছাকাছি রাণী নামে একটি জায়গার অধিবাসী ছিলেন বলে শোনা যায়। অসমীয়াদের সাথে কিছু ঘনিষ্ঠতা হল[39]:

না বোধক শব্দ - অসমীয়াতে না বোধক শব্দ ক্রিয়াপদের আগে চলে আসে: না যাই (২, ৫, ২০, ২৯ নং); না জীবামী (৪ নং); না ছদা, না জানি, না ডিসা (৬ নং)। ১৫ নং চর্যায় এরকম ৯টি রূপ রয়েছে।

বর্তমান কৃদন্ত (প্রেজেন্ট পার্টিসিপল) - বৈষ্ণব যুগে অসমীয় ভাষায় -ante প্রত্যয় ব্যবহৃত হত যেমন - jvante (বেঁচে থাকার সময়, ২২ নং); sunante (শোনার সময়, ৩০ নং) ইত্যাদি।

অসমাপিকা ক্রিয়া – -i এবং -iya প্রত্যয় যথাক্রমে আধুনিক ও পুরাতন অসমীয়াতে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, চর্যাপদেও তা লক্ষ্য করা যায়: kari (৩, ৩৮ নং); cumbi (৪ নং); maria (১১ নং); laia (২৮ নং) ইত্যাদি।

সাধারণ বর্তমান ক্রিয়া রূপ - চর্যাপদের ভাষার প্রত্যয় -ai অসমীয়াতে -e রূপে পরিবর্তিত হতে দেখা যায় - bhanai (১); tarai (৫); pivai (৬)।

ভবিষ্যত - প্রত্যয় -iva অসমীয় ভাষার মত চর্যাপদেও দেখা যায়: haiba (৫); kariba (৭)।

নাম বিভক্তি - অসমীয়া ভাষার নাম বিভক্তি -e (এ) কেস শেষ হবে ই : কুম্ভিরে খা, কোর নীলা (২)।

তৃতীয়া বিভক্তি - অসমীয় ভাষার বিভক্তি -e এবং -era চর্যাপদেও দেখা যায়: uju bate gela (১৫); kuthare chijaa (৪৫)।

চর্যাপদগুলির শব্দভাণ্ডারে কিছু অ-তৎসম শব্দ পাওয়া যায় যেগুলো এখন অসমীয় শব্দভাণ্ডারের অন্তর্গত, যেমন dala (১), thira kari (৩, ৩৮), tai (৪), uju (১৫), caka (১৪) ইত্যাদি।

ওড়িয়া ভাষার সাথে সম্পর্ক#edit

ওড়িয়া কবিতার শুরু চর্যা সাহিত্যের বিকাশের সাথে মিলে যায়, এই সাহিত্যচর্চার শুরু হয় মহাযান বৌদ্ধ কবিদের দ্বারা।[40] এই সাহিত্য "সন্ধ্যা ভাষা" নামে একটি নির্দিষ্ট আকারে লেখা হয় এবং কাহ্নপার মত কবিরা উড়িষ্যা অঞ্চলের বাসিন্দা। চর্যার ভাষাকে প্রাকৃত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। করুণাকর কর তাঁর গ্রন্থে (আশ্চর্য চর্যাছায়া) উল্লেখ করেছেন যে, উড়িষ্যাই চর্যাপদের উৎপত্তিস্থল কারণ বৌদ্ধধর্মের বজ্রযান সম্প্রদায় সেখানে বিকশিত হয় এবং সেখানেই বৌদ্ধধর্মে নারী পূজা শুরু হয়। মাতৃ ডাকিনির পূজা এবং "কায়া সাধনা" চর্চা এই ধরনের নতুন সংস্কৃতির ফলাফল। একটি তত্ত্ব অনুসারে লক্ষ্মীঙ্করা ও পদ্মসম্ভবের মত বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ উড়িষ্যায় জন্মগ্রহণ করেন (এই তত্ত্ব অনুসারে এদের জন্মস্থান ওড্ডিয়ান হল আসলে উড়িষ্যা)।[41] চর্যাপদে আদি সিদ্ধদের তৈরি কায়া সাধনা এবং শাকি উপাসনার (নারী নীতির উপাসনা) ধারণা ও অভিজ্ঞতার কাব্যিক অভিব্যক্তি পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে পূর্ব ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভাষার আদিম রূপ প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় রচিত প্রথম সাহিত্যিক দলিল। অনেকে দাবী করে যে, চর্যাপদের কবিরা প্রধাণত এই অঞ্চলের এবং তাদের চিন্তা ও লেখার শৈলী প্রাচীন ওড়িয়া সাহিত্যের কবিতাকে প্রভাবিত করেছে যা প্রধানত পঞ্চশাখা যুগে রচিত ষোড়শ শতাব্দীর ওড়িয়া কবিতায় উল্লেখযোগ্য।[42] চর্যাপদে ব্যবহৃত রাগ, বিশেষ করে মহাসিদ্ধদের লেখা গানের রাগগুলোর উৎপত্তিও উড়িষ্যার বলে বর্ণনা করা হয় (ঐতিহ্যবাহী জীবনীগুলো অনুসারে), এদের সাথে ওডিসি সঙ্গীতের (উড়িষ্যার সংগীত) ঐতিহ্যবাহী ব্যবহৃত রাগের সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে, যা দ্বাদশ শতকের গীত গোবিন্দ থেকে ১৪শ থেকে ১৯শ শতকের ধ্রুপদী ওড়িয়া সাহিত্য পর্যন্ত বিস্তৃত।

কাহ্নপার কবিতার ভাষার সাথে ওড়িয়ার ভাষার খুব ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ,

Ekasa paduma chowshathi pakhudi Tahin chadhi nachaa dombi bapudi

Paduma (পদ্ম), Chausathi (চৌষট্টি), Pakhudi (পাপড়ি) Tahin (সেখানে), Chadhi (চড়ে), nachai (নাচে), Dombi (তফসিলি সম্প্রদায়ের নারী, বাংলা ও উড়িষ্যা উভয় অঞ্চলেই এই শব্দটির ব্যবহার আছে), Bapudi (কথ্য ওড়িয়া ভাষায় "দরিদ্র ব্যক্তি" অর্থে ব্যবহৃত হয়)।

এছাড়া একটি মত অনুসারে জয়দেব ভারতের উড়িষ্যা প্রদেশের পুরীর নিকটবর্তী কেন্দ্রবিল্ব শাসনের ব্রাহ্মণ পরিবারের মানুষ ছিলেন। স্বয়ং জয়দেব লিখেছিলেন "কেন্দবিল্ব সমুদ্র সম্ভব"৷ উড়িষ্যা ও দাক্ষিণাত্যর সংস্কৃৃতিতে জয়দেবের প্রভাব অনস্বীকার্য। জয়দেবের গীতগোবিন্দের কিছু লেখায় "অর্ধ-মাগধী পদাশ্রিত গীতি" রয়েছে যেগুলো চর্যাগীতি দ্বারা প্রভাবিত। যদি তাই হয় তাহলে জয়দেবের গীতগোবিন্দের কিছু লেখায় "অর্ধ-মাগধী পদাশ্রিত গীতিতে" চর্যাগীতির প্রভাব চর্যাভাষার সাথে ওড়িয়া সম্পর্ককেই নির্দেশ করবে।

সন্ধ্যা ভাষা#edit

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাচার্য-বিনিশ্চয় গ্রন্থের ভূমিকায় মুনিদত্তের সংস্কৃত ধারাভাষ্যের উপর ভিত্তি করে চর্যাপদের শ্লোকের রহস্যময় ভাষাকে সান্ধ্যভাষা বা আলো-আঁধারি ভাষা (অর্ধ-প্রকাশিত এবং অর্ধ-লুকানো) হিসেবে উল্লেখ করেন। বিধুশেখর শাস্ত্রী বেশ কিছু বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে প্রমাণের ভিত্তিতে পরে এই ভাষাকে 'ইচ্ছাকৃত ভাষা' (সংস্কৃত: সন্ধ্যা-ভাষা) হিসেবে উল্লেখ করেন।[43] চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। সেই কারণে চর্যায় ব্যবহৃত ভাষাকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন সন্ধ্যাভাষা। তাঁর মতে,

সহজিয়া ধর্মের সকল বই-ই সন্ধ্যা ভাষায় লেখা। সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিকটা বুঝা যায় না। অর্থাৎ, এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্মকথার ভিতরে একটা অন্য ভাবের কথাও আছে। সেটা খুলিয়া ব্যাখ্যা করিবার নয়। যাঁহারা সাধনভজন করেন তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই।

[44]

বজ্রযানী ও সহজযানী গ্রন্থকারগণ প্রায়শ ‘সন্ধ্যাভাষয়া বোদ্ধব্যম্’ বলে এক রহস্যের ইঙ্গিত দিতেন। বজ্রযানী গ্রন্থগুলিতে ‘সন্ধ্যাভাষা’ শব্দটি বহুল-ব্যবহৃত। তিব্বতি ভাষায় ‘সন্ধ্যাভাষা’র অর্থ ‘প্রহেলিকাচ্ছলে উক্ত দুরুহ তত্ত্বের ব্যাখ্যা’। যদিও মহামহোপাধ্যায় বিধুশেখর শাস্ত্রী ও ডক্টর প্রবোধচন্দ্র বাগচী ‘সন্ধ্যা’র বদলে সন্-ধা ধাতু থেকে নিষ্পন্ন ‘সন্ধা’ শব্দটি ব্যবহারের পক্ষপাতী। তাঁদের মতে, ‘সন্ধ্যা’ লিপিকরদের প্রমাদ। "সন্ধা" শব্দের অর্থ ‘অভিপ্রেত, উদ্দিষ্ট, আভিপ্রায়িক বচন’। ম্যাক্সমুলার ‘সন্ধা’র অর্থ করেছেন "প্রচ্ছন্ন উক্তি" ("hidden saying")। চর্যার ধর্মীয় প্রসঙ্গের সঙ্গে ‘সন্ধা’ এ-দিক দিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য হলেও, যেহেতু অধিকাংশ পুঁথিতেই ‘সন্ধ্যা’ শব্দটি রয়েছে সেই কারণে হরপ্রসাদের অর্থেই আধুনিক গবেষকগণ এই শব্দটি গ্রহণ করেছেন।[45]

চর্যাপদের গুপ্ত ভাষার বৌদ্ধ – তান্ত্রিক ব্যাখ্যার চেষ্টা করা হয়েছে।[46]

ভাষাতত্ত্ব#edit

প্রাচীন বাংলার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলির সন্ধানে প্রাকৃত বাংলায় রচিত চর্যাপদ একটি মূল্যবান উপাদান। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রথম এই বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেন তাঁর The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে। এরপর ডক্টর সুকুমার সেন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, তারাপদ মুখোপাধ্যায়, পরেশচন্দ্র মজুমদার ও ডক্টর রামেশ্বর শ' চর্যার ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন। ফলে আজ চর্যার ভাষার স্বরূপটি অনেক বেশি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।[47]

ধ্বনিতত্ত্ব#edit

  • চর্যায় অ-কার কিছু বেশি বিবৃত (open); কতকটা আধুনিক আ-এর কাছাকাছি। সম্ভবত আদিস্বরের শ্বাসাঘাতের জন্য অ/আ ধ্বনির বিপর্যয় দেখা যায়। যেমন: অইস/আইস, কবালী/কাবালী, সমাঅ/সামাঅ ইত্যাদি।
  • ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রে প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: পদমধ্যে ‘হ’-ধ্বনির সংরক্ষণ (যেমন: খনহ, তঁহি, করহ ইত্যাদি); মহাপ্রাণ বর্ণের অস্তিত্ব (যেমন: আক্ষে, কাহ্ন, দিঢ় ইত্যাদি) এবং ওড়িযা-সুলভ ‘ল’ (l)-ধ্বনি বজায় থাকা।
  • প্রাকৃতের সমযুগ্মব্যঞ্জন সরলীকৃত হয়ে চর্যায় একক ব্যঞ্জনে পরিণত হয়েছে। ফলে পূর্বস্বরের পূরকদীর্ঘত্ব ঘটেছে। যেমন: প্রাচীন ভারতীয় আর্য ‘মধ্য’> মধ্য ভারতীয় আর্য "মজ্ঝ" > প্রাকৃত বাংলা ‘মাঝ’ ইত্যাদি।
  • নাসিক্যব্যঞ্জনের পূর্বস্বর দীর্ঘত্বলাভের সঙ্গে সঙ্গে অনুনাসিক হয়ে গেছে। যেমন: চন্দ্র>চন্দ>চাঁদ ইত্যাদি।
  • পাশাপাশি অবস্থিত একাধিক স্বরধ্বনির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। যেমন: উদাস>উআস। পদান্তেও স্বরধ্বনির ব্যবহার দেখা যায়। যেমন: ভণতি>ভণই ইত্যাদি।
  • পদান্তে স্থিত একাধিক স্বর যৌগিক স্বররূপে উচ্চারিত হতো এবং ক্রমে দুইয়ে মিলে একক স্বরে পরিণত হত। যেমন: প্রাচীন ভারতীয় আর্য ‘পুস্তিকা’> মধ্য ভারতীয় আর্য ‘পোত্থিআ’> প্রাকৃত বাংলা ‘পোথী’ ইত্যাদি।
  • ‘য়’-শ্রুতি বিদ্যমান ছিল; ‘ব’-শ্রুতিও দেখা গেছে। যেমন: নিয়ড্ডী>নিয়ড়ি; নাই>নাবী ইত্যাদি।
  • চর্যায় স্বরসংগতির দু-একটি উদাহরণ মেলে। যেমন: সসুরা (< শ্বশুর) ইত্যাদি।
  • "শ", "ষ", "স" এবং "ন", "ণ" – এর যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যায়। যেমন: নিঅ/ণিঅ, নাবী/ণাবী, সহজে/ষহজে, আস(< আশা) ইত্যাদি।
  • দীর্ঘস্বর ও হ্রস স্বরের উচ্চারণের পার্থক্য হ্রাস পেয়েছিল। যেমন: শবরি/সবরী, জোই/জোঈ ইত্যাদি।
  • পদের আদিতে "য" – ধ্বনি "জ" – ধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। যেমন: জাই/যাই।

রূপতত্ত্ব#edit

  • চর্যার নামপদের লিঙ্গভেদ ছাড়াও সর্বনাম, বিশেষণ, সম্বন্ধবাচক শব্দেও লিঙ্গভেদ ছিল। যেমন: হরিণ/হরিণী, শবরা/শবরী, ‘রাতি পোহাইলি’, ‘গুঞ্জরী মালী’ ইত্যাদি।
  • একবচন-বহুবচনের পার্থক্য ছিল; সংখ্যাবাচক শব্দযোগে, সমষ্টিবাচক পদযোগে এবং দ্বিরুক্তিপদ প্রয়োগের দ্বারা বহুবচন বোঝান হতো। যেমন: ‘বতিস জোইনী’, ‘পঞ্চবিডাল’, ‘উঁচা উঁচা পাবত’ ইত্যাদি।
  • চর্যায় কারক মুখ্যত দুটি। যথা: মুখ্যকারক ও গৌণকারক। মুখ্যকারকে বিভক্তি শূণ্য বা – এ। যেমন: ‘সরহ ভণই’, ‘কুম্ভীরে খাঅ’ ইত্যাদি। গৌণকারকে – এঁ বা – এ বিভক্তি। যেমন: ‘সহজে থির করি’ (কর্ম কারক), "কুঠারে ছিজঅ" (করণ কারক), "হিএঁ মাঝে" (অধিকরণ কারক) ইত্যাদি। বিভক্তিহীনতার উদাহরণও পাওয়া যায়। যেমন: ‘কায়া তরুবর’।
  • – এর ও -ক বিভক্তির মাধ্যমে সম্বন্ধপদ নিষ্পন্ন হতো। যেমন: ‘রুখের তেন্তুলি’, ‘করণক পাটের আস’ ইত্যাদি।
  • – ক, – কে ও – রে বিভক্তি দ্বারা গৌণকর্মের ও সম্প্রদানের পদসিদ্ধ হতো। যেমন: ‘নাশক’, ‘বাহবকে পারই’, ‘রসানেরে কংখা’ ইত্যাদি।
  • – ই, – এ, – হি, – তেঁ ও –ত অধিকরণের বিভক্তি হিসাবে ব্যবহৃত হতো। যেমন: ‘নিঅড়ি’, ‘ঘরে’, ‘হিঅহি’, ‘সুখদুখেতেঁ’, ‘হাঁড়িত’ ইত্যাদি।
  • করণের বিশিষ্ট বিভক্তি –এঁ সপ্তমীর সঙ্গে প্রায় অভিন্ন হওয়ার কারণেও – তেঁ, – এতেঁ, – তে বিভক্তি দেখা যায়। যেমন: ‘সাঁদে’ (<শব্দেন), ‘বোধেঁ’ (<বোধেন), ‘মতিএঁ’, ‘সুখদুখেতেঁ’ (< সুখদুঃখ + এ + ত + এন)।
  • অপাদানে অপভ্রষ্ট থেকে আগত – হুঁ বিভক্তি দু-একটি পাওয়া গেছে। যেমন: ‘খেপহুঁ’, ‘রঅনহুঁ’।
  • চর্যাপদে গৌণকারকে ব্যবহৃত অনুসর্গেও (postposition) বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন: ‘ডোম্বী-এর সঙ্গে’ (নামবাচক অনুসর্গ), ‘দিআঁ চঞ্চালী’ (অসমাপিকা অনুসর্গ)।
  • সংস্কৃতের মতো কর্মভাববাচ্যের প্রচুর উদাহরণ চর্যাপদে আছে। যেমন: ‘নাব ন ভেলা দীসই’, ‘ধরন ন জাই’ ইত্যাদি।
  • চর্যাপদে যৌগিক কালের উদাহরণ না থাকলেও যৌগিক ক্রিয়ার উদাহরণ প্রচুর আছে। যেমন: ‘গুণিআ লেহুঁ’, ‘নিদ গেল’ ইত্যাদি।
  • নিষ্ঠাপ্রত্যয়ে – এ বিভক্তি দেখা যায়। যেমন: ‘সহজে থির করি’ ইত্যাদি।
  • চর্যায় এমন সব বিশিষ্ট প্রয়োগ আছে যা বাংলা ভাষাভিন্ন অন্য ভাষায় পাওয়া যায় না। যেমন: ‘ভান্তি ন বাসসি’, ‘দুহিল দুধু’ ইত্যাদি।
  • কর্মভাববাচ্যে অতীতকালে – ই, – ইল এবং ভবিষ্যতকালে – ইব বিভক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন: ‘চলিল কাহ্ন’, ‘মই ভাইব’ ইত্যাদি।
  • প্রাচীন বাংলার চর্যাপদে ব্যবহৃত প্রবচনগুলি বাংলা ভাষায় ঐতিহ্যবাহী। যেমন: ‘হাড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী’, ‘আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী’ ইত্যাদি।

ছন্দ ও অলংকার#edit

চর্যার পদগুলি প্রধানত পয়ার ও ত্রিপদী পদে রচিত। এতে মাত্রাছন্দের প্রভাবও দেখা যায়। ১৬ মাত্রার পাদাকুলক ছন্দের ব্যবহারই এখানে বেশি। তবে সর্বত্র নির্দিষ্ট মাত্রারীতি দেখা যায়নি। ছন্দপংক্তির পর্বসংখ্যাগত বৈচিত্র্যও এই পদগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ডক্টর অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, “তত্ত্বকথার ব্যাখ্যা এবং তাকে ব্রাহ্মণ সমাজের শ্যেনদৃষ্টি থেকে গোপন করা – এই দিকে পদকর্তারা এবং সিদ্ধাচার্যরা অত্যন্ত সচেতন ছিলেন বলে কবিতার আঙ্গিকের দিকে দৃষ্টি দেবার অবকাশ পাননি। তবে একটা কথা সত্য, চর্যাগানেই সর্বপ্রথম পয়ার-ত্রিপদীর আদিসুর ধ্বনিত হয়েছে। সংস্কৃতে রচিত গীতগোবিন্দও এর প্রভাব অস্বীকার করতে পারেনি।”[48]

চর্যায় অনুপ্রাসের প্রয়োগ ব্যাপক। প্রায় প্রতিটি পদই অন্ত্যমিলযুক্ত। অন্তানুপ্রাসও প্রচুর। যেমন: “বাহ তু ডোম্বী বাহ লো ডোম্বী বাটত ভইলা উদারা”। চর্যায় উল্লিখিত ছন্দ ও অলংকারগুলি পরবর্তীকালের কবিদের পথপ্রদর্শকস্বরূপ হয়েছিল।[48]

চর্যাপদ পুঁথির একটি পৃষ্ঠা
চর্যাপদ পুঁথির একটি পৃষ্ঠা Image: source and license


চর্যাসংগীত#edit

চর্যাপদ একাধিক চরণবিশিষ্ট, অন্ত্যমিলযুক্ত ও গীতিধর্মী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংস্কৃত সাহিত্যের চিত্রধর্মী শ্লোক বাংলা সাহিত্যের উপর কোনও স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। বরং চর্যার গীতিকবিতাগুলিই পরবর্তী বাংলা কাব্যসঙ্গীতের আঙ্গিকের ক্ষেত্রে আদর্শ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে চর্যার কবিরা যে তাঁদের ধর্মদর্শন ও সাধনপদ্ধতি রূপকের আড়ালে ব্যক্ত করে গান বেঁধেছিলেন, পরবর্তীকালের হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সাধককবিরা সেই আদর্শেই তাঁদের স্ব স্ব ধর্মীয় সাধনসঙ্গীত রচনায় প্রবৃত্ত হন। বৈষ্ণব পদাবলি, বাউল গান, সুফি মুর্শিদি গান, নাথপন্থী দেহযোগী গান বা শাক্তপদাবলি– সবই চর্যাসংগীতের উত্তরসূরী।[49]

চর্যার পদগুলিতে পদকর্তাদের নামের সঙ্গে বিভিন্ন রাগ-রাগিনীর নামও পাওয়া যায়। এথেকে সহজেই অনুমিত হয় যে, এই পদগুলি সুরসহযোগে গাওয়া হতো। পটমঞ্জরী রাগে চর্যার ১১টি পদ (পদ –১, ৬, ৭, ৯, ১১, ১৭, ২০, ২৯, ৩১, ৩৩ ও ৩৬) নিবদ্ধ। এই রাগে গাওয়া পদের সংখ্যাই সর্বাধিক। এরপরেই মল্লারী রাগে ৫টি পদ (পদ – ৩০, ৩৫, ৪৪, ৪৫ ও ৪৯) নিবদ্ধ রয়েছে। ৪টি করে পদ ভৈরবী (পদ-১২, ১৬, ১৯ ও ৩৮), কামোদ (পদ – ১৩, ২৭, ৩৭ ও ৪২), বরাড়ী (চর্যায় অপর নাম বলাড্ডি, পদ- ২১, ২৩, ২৮ ও ৩৪) এবং গুঞ্জরী (চর্যায় অপর নাম গুঁজরী বা কহূ গুংজরী, পদ – ৫, ২২, ৪১ ও ৪৭) রাগে নিবদ্ধ। গৌড় (চর্যায় নাম গবড়া বা গউড়া, পদ – ২, ৩, ১৮) রাগে ৩টি পদ নিবদ্ধ। দেশাখ (চর্যায় অপর নাম দ্বেশাখ, পদ – ১০ ও ৩২), রামকেলি (চর্যায় অপর নাম রামক্রী, পদ – ১৫ ও ৫০), আশাবরী (চর্যায় অপর নাম শিবরী বা শবরী, পদ – ২৬ ও ৪৬) ও মালসী (চর্যায় অপর নাম মালসী গবুড়া, পদ- ৩৯ ও ৪০) রাগে ২টি করে এবং অরু (পদ ৪), দেবগিরি (চর্যায় অপর নাম দেবক্রী, পদ ৮), ধানশী (চর্যায় অপর নাম ধনসী,পদ ১৪) ও বঙ্গাল (পদ ৩৩) রাগে একটি করে পদ নিবদ্ধ। ২৫তম পদটি খণ্ডিত ও এর রাগনির্দেশ জানা যায় না।[50]

চর্যাগীতিতে প্রতি পদের প্রত্যেক দুই লাইনের শেষে ধ্রু এই শব্দটি পাওয়া যায়, যা ধুঁয়া বা ধ্রুবপদের সংকেত বলে ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় মনে করেছেন। চর্যাপদের সংস্কৃত টীকাতে ধ্রুবপদেন দৃঢ়ীকুর্বন, ধ্রুবপদেন চতুর্থানন্দমুদ্দীপয়ন্নাহ ইত্যাদি ব্যাখ্যা থেকে এই প্রমাণ পাওয়া যায়। তিব্বতীতে এই পদকে ধু পদ বলা হয়েছে। প্রত্যেক পদ গাইবার পর শ্রোতাকে আকৃষ্ট করার জন্য বারবার ধ্রুবপদ গাইবার রীতি ছিল।[51]

বাংলা ভাষা ও সঙ্গীতের প্রাচীন নিদর্শন  চর্যাপদ। ১৯০৭ সালে  হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে এর  পুথি আবিষ্কার করেন। আবিষ্কৃত পুথিটির নাম চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়। এটি মূলত প্রাপ্ত ৪৭টি গানের সংকলন। খ্রিস্টীয় নবম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে গানগুলি রচিত।[52]

বর্তমান কালের বাংলা গানের স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ এই চার কলির পরিবর্তে সেকালে ছিল উদ্গ্রাহ, মেলাপক, ধ্রুব ও আভোগ। এগুলিকে বলা হতো ধাতু। এই চারটি ধাতুর মধ্যে উদ্গ্রাহ ও ধ্রুব সব গানেই থাকত, অন্য দুটি বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই একটি ধাতু বর্জিত হলে সেই গানকে বলা হতো ত্রিধাতুক, আর দুটি বর্জিত হলে দ্বিধাতুক। সাধারণভাবে সঙ্গীতকে তখন প্রবন্ধগীত বলা হতো। মেলাপকবর্জিত বলে চর্যাগুলি ত্রিধাতুক প্রবন্ধগীত।[52]

ধর্ম#edit

চার্যার কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ, তবে চার্যায়- ১) প্রথম, দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ পদে আমরা বেদ ব্রাহ্মণ ও আর্য যোগীদের পরিচয় পাই। ২) পঞ্চম পদে বৌদ্ধদের কথার উল্লেখ পাই। ৩) তৃতীয় ও চতুর্থ পদে রয়েছে জৈন সাধুরা।

সিদ্ধাচার্যগণ অসামান্য কবিত্বশক্তির অধিকারী হলেও তারা মূলত ছিলেন সাধক। বৌদ্ধ সহজযানী চিন্তা, দর্শন ও সাধনপদ্ধতিই তাই চর্যাপদের উপজীব্য হয়ে ওঠে। এই সহজযানী দর্শন একান্তই ভাববাদী। সিদ্ধাচার্যগণ সহজমার্গের পথিক ছিলেন। শুষ্ক তত্ত্বকথা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট থাকতেন না। সেজন্য প্রথাগত সংস্কারের ধারও তারা ধরতেন না।

মায়াপ্রপঞ্চ ও দ্বৈতবোধের ঊর্ধ্বে স্থিত যে ‘বোধিচিত্ত’, সকল প্রকার দ্বৈতবোধ পরিহার করে সাধনযোগে অবধূতিকামার্গের পথে সেই ‘বোধিচিত্ত’কে ‘মহাসুখকমল’-এ স্থিত করাই সিদ্ধাচার্যদের সাধনার লক্ষ্য ছিল।[53] এই ‘মহাসুখ’ সহজযান মতে একটি বিশেষ তত্ত্ব। সাধক ‘মহাসুখ’ লাভ করলে মায়াময় পৃথিবী সম্পর্কে জ্ঞানরহিত হন। এখানে হিন্দুদর্শনের সমাধিতত্ত্বের সঙ্গে ‘মহাসুখ’ দর্শনের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। চর্যাকারগণ গুরুবাদকে স্বীকার করেছেন। কুক্কুরীপাদের মতে, এক কোটি লোকের মধ্যে একজন চর্যার গূহ্যার্থ অনুধাবনে সক্ষম। সেক্ষেত্রে গুরুভিন্ন গতি নেই।[54] বাস্তবিকই চর্যার কথা লৌকিক অর্থের বদলে সংকেতে আবৃত হওয়ায় তা সর্বসাধারণের বুদ্ধিতে ঠিক ধরে না। এই দ্বৈতার্থের কয়েকটি নিদর্শন হলো: নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস অর্থে 'চন্দ্র', চিত্ত অর্থে 'হরিণ', জ্ঞানমুদ্রা অর্থে 'হরিণী', মহাসুখকায় অর্থে 'নৌকা', শবরী অর্থে 'দেবী নৈরাত্মা' ইত্যাদি।[55]

চর্যাপদে নারীদের অবস্থান#edit

চর্যাপদের যুগে নারীরা খুব স্বাধীন ছিলেন বলে জানা যায়। তারা স্বেচ্ছায় সঙ্গী ও পেশা নির্বাচনের অধিকার রাখতেন। ২ নম্বর পদে কুক্কুরীপা গৃহবধূর ছল করা নিয়ে বলেছেন, "সে দিনের বেলায় কাকের ডাকে ভয় পায়, কিন্তু রাতে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে যায়।" ডোম্বীপাদের ১৪ নম্বর পদে নারীদের নৌকা চালনা, লোক পারাপার ইত্যাদি কর্মে অংশগ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া সেসময় নারীরা গুরুর স্থানও অধিকার করেছিল।[56]

প্রবাদ#edit

চর্যাপদে প্রবাদ বাক্য ৬টি।[57] এগুলো হলো:

প্রবাদপদে অবস্থায়কবির নামঅর্থ
আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী৬ নং  পদভুসুক পাহরিণের মাংসই তার জন্য শত্রু
হাতের কাঙ্কন মা লোউ দাপন৩২ নং পদসরহ পাহাতের কাঁকন দেখার জন্য দর্পণের প্রয়োজন হয় না
হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী৩৩ নং পদঢেগুণ পাহাড়িতেঁ ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন প্রেমিকেরা এসে ভীড় করে
দুহিল দুধু কী বেন্টে সামায়৩৩ নং পদঢেগুণ পাদোহন করা দুধ কি বাটে প্রবেশ করানো যায়?
বর সুন গোহালী কিমু দুঠ্য বলন্দেঁ৩৯ নং পদসরহ পাদুষ্ট গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল ভালো
আন চাহন্তে আন বিনধা৪৪ নং পদকঙ্কন পাঅন্য চাহিতে, অন্য বিনষ্ট

পাদটীকা#edit

  1. অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় মন্তব্য করেছেন, “যত গূহ্য অধ্যাত্মসাধনার গূহ্যতর তত্ত্বই ইহাদের মধ্যে নিহিত থাকুক না কেন, স্থানে স্থানে এমন পদ দু’চারটি আছে যাহার ধ্বনি, ব্যঞ্জনা ও চিত্রগৌরব এক মুহূর্তে মন ও কল্পনাকে অধিকার করে। অথচ, এ-কথাও সত্য যে, সাহিত্যসৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই গীতগুলি রচিত হয় নাই, হইয়াছিল বৌদ্ধ সহজসাধনার গূঢ় ইঙ্গিত ও তদনুযায়ী জীবনাচরণের (চর্যার) আনন্দকে ব্যক্ত করিবার জন্য। সহজ সাধনার এই গীতিগুলি কর্তৃক প্রবর্তিত খাতেই পরবর্তীকালের বৈষ্ণব সহজিয়া গান, বৈষ্ণব ও শাক্ত-পদাবলী, আউল-বাউল-মারফতী-মুর্শিদা গানের প্রবাহ বহিয়া চলিয়াছে।”[58]

তথ্যসূত্র#edit

  1. ^ প্রতিবেদক, নিজস্ব (১২ এপ্রিল ২০১৯)। "চর্যাপদের পুঁথি আবিষ্কার ও গান সংগ্রহের ধারাক্রম"। দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ১৯ জানুয়ারি ২০২৫।
  2. ^ চর্যাগীতি পরিক্রমা, ড. নির্মল দাশ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০২২ সংস্করণ, পৃ. ১১
  3. ^ চর্যাগীতি পরিক্রমা, ড. নির্মল দাশ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০২২ সংস্করণ, পৃ. ১১-১২
  4. ^ a b সেন, সৌহার্দ্য (২৫ অক্টোবর ২০১৯)। "পৌরাণিক ইতিহাস: আঘোরী/অঘোরী (পর্ব- ১)"। দ্য বেংগালি মিরর। সংগ্রহের তারিখ ১১ এপ্রিল ২০২৫।
  5. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১২৯-১৩০
  6. ^ চর্যাগীতি পরিক্রমা, ড. নির্মল দাশ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০২২ সংস্করণ, পৃ. ১২
  7. ^ চর্যাগীতি পরিক্রমা, ড. নির্মল দাশ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০২২ সংস্করণ, পৃ. ২৩৯
  8. ^ বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস, ক্ষেত্র গুপ্ত, গ্রন্থনিলয়, কলকাতা, ২০০১, পৃ. ৪৪
  9. ^ ড. নির্মল দাশ (১৯৮২)। চর্যাগীতি পরিক্রমা। আলফা পাবলিশিং কনসার্ন। পৃ. ১৩।
  10. ^ চর্যাগীতি পরিক্রমা, ড. নির্মল দাশ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০২২ সংস্করণ, পৃ. ১২
  11. ^ চর্যাগীতিকা‌, মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশা (সম্পাদিত), ষষ্ঠ সংস্করণ, ১৪১৪ বঙ্গাব্দ, স্টুডেণ্ট ওয়েজ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
  12. ^ "বাংলাপিডিয়ায় চর্যাপদ"। ১ জুন ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১২ ডিসেম্বর ২০১৯।
  13. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৩২
  14. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৩৩
  15. ^ a b c বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৩৬
  16. ^ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত। পৃ. ১৬।
  17. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ৫০৪-১৩ দ্রঃ
  18. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৩৭
  19. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৩৭-৩৮
  20. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৩৮
  21. ^ a b c চর্যাগীতি-পদাবলী, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৫, পৃ. ১৮
  22. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ৮৫-৮৬
  23. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৩৯
  24. ^ চর্যাগীতি-পদাবলী, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৫, পৃ. ১৮-১৯
  25. ^ Bandyopadhyay, Debaprasad (২০১৪)। ""The Movement Within: A Secret Guide To Esoteric Kayaasadhanaa: Caryaapada"."। Journal of Bengali Studies। ৩ (1): ১১৩–২৭। ১০ জুলাই ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০২২।
  26. ^ Bandyopadhyay, Debaprasad। "চর্যা-চর্চায় নীরবতার ভাষাতত্ত্ব সন্ধান : উপক্রমনিকা (Searching for Linguistics of Silenceme: Caryapada)"। 2012. "চর্যা-চর্চায় নীরবতার ভাষাতত্ত্ব সন্ধান"[In Search of Linguistics of Silence : Caryapada] Pranab K. Chakroborty ed. Interaction VIII. (pp.23-31) Nabadwip, West Bengal. India। ১০ জুলাই ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০২২।
  27. ^ হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। পৃ. ১২।
  28. ^ হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। পৃ. ১২।
  29. ^ The History and Culture of the Indian People। Bharatiya Vidya Bhavan। ১৯৬০। পৃ. ৫১৬, ৫১৯।
  30. ^ Basu, Sajal (১৯৯৪)। Jharkhand Movement: Ethnicity and Culture of Silence (ইংরেজি ভাষায়)। Indian Institute of Advanced Study। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮৫৯৫২-১৫-৪।
  31. ^ মাহাতো, কিরীটি (২০১৩)। ঝুমুর ও চর্যাপদ। রামকৃষ্ণপুর, পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ: মুলকি কুড়মালি ভাখি বাইসি। পৃ. ভূমিকা অংশ।
  32. ^ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ (১৯৫৮)। বাংলা সাহিত্যের কথা, ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
  33. ^ সুকুমার সেন (১৯৬০)। প্রাচীন বাংলা সাহিত্য, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
  34. ^ Chatterji, Suniti Kumar (1926). The Origin and Development of the Bengali Language, Calcutta University Press.
  35. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৪১-৪২
  36. ^ Parhi, Kirtan Narayan (মে–জুন ২০১০)। Orissa Review (পিডিএফ)। Department of Culture, Government of Odisha। পৃ. ৩২–৩৫। ৯ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত (পিডিএফ)। সংগ্রহের তারিখ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০।
  37. ^ a b বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৪৩
  38. ^ Chatterjee, S.K. The Origin and Development of Bengali Language, Vol.1, Calcutta, 1926, pp.112
  39. ^ Language and Literature from The Comprehensive History of Assam Vol 1, ed H K Barpujari, Guwahati 1990
  40. ^ Mukherjee, Prabhat. The History of medieval Vaishnavism in Orissa. Chapter : The Sidhacharyas in Orissa Page:55.
  41. ^ Kar. Karunakar. Ascharya Charyachaya
  42. ^ Datta, Amaresh। The Encyclopaedia of Indian Literature (Volume One (A To Devo))। Sahitya Akademi publications। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২৬০-১৮০৩-১।
  43. ^ Indian Historical Quarterly, Vol.IV, No.1, 1928 CE, pp.287–296
  44. ^ হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, ১৩২৩ দ্রঃ
  45. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৪৪-৪৫
  46. ^ চর্যা-চর্চায় নীরবতার ভাষাতত্ত্ব সন্ধান : উপক্রমনিকা
  47. ^ সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, ড. রামেশ্বর শ’, পুস্তক বিপণি, কলকাতা, পৃ. ৬২৭-৩২ দ্র.
  48. ^ a b বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৪৫-১৪৬
  49. ^ বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস, ক্ষেত্র গুপ্ত, গ্রন্থনিলয়, কলকাতা, ২০০১, পৃ. ৪৭
  50. ^ চর্যাগীতি পদাবলী, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৫, ‘মূল পাঠ’ ও ‘শব্দকোষ’ অংশ দ্র.
  51. ^ বাঙ্গালীর ইতিহাস - আদি পর্ব , নীহাররঞ্জন রায়, দে'জ পাবলিশিং, কলকাতা, ষষ্ঠ সংস্করণ, মাঘ ১৪১৪, পৃষ্ঠা ৬৩৮, আইএসবিএন ৮১-৭০৭৯-২৭০-৩
  52. ^ a b "সঙ্গীত - বাংলাপিডিয়া"। bn.banglapedia.org। ২২ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
  53. ^ বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস, ক্ষেত্র গুপ্ত, গ্রন্থনিলয়, কলকাতা, ২০০১, পৃ. ৪৫
  54. ^ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১১৮-২৯ ও ১৪৭-৫০
  55. ^ চর্যাগীতি-পদাবলী, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৫, পৃ. ৩৩
  56. ^ চর্যাপদে নারীদের স্থান ও ভূমিকা। সৌমিত্র শেখর। ২০১৪। পৃ. ২১৩।
  57. ^ চর্যাপদের সাধারণ আলোচনা (দ্বিতীয় সংস্করণ)। শীকর পাবলিকেশন্স, ঢাকা। পৃ. ১৭। {{বই উদ্ধৃতি}}: |সংগ্রহের-তারিখ= এর জন্য |ইউআরএল= প্রয়োজন (সাহায্য)
  58. ^ বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, অগ্রহায়ণ, ১৪১০, পৃ. ৬০৮

আরও দেখুন#edit

বহিঃসংযোগ#edit

This article is mirrored from “চর্যাপদ” on বাংলা Wikipedia, revision 9135753, written by Wikipedia's contributors and licensed CC BY-SA 4.0. Editing it here creates a Quire copy with its own history.

Synced with Wikipedia revision 9135753 · just now